৬ পর্ব:

.

আগের পর্ব গুলো পেজে দেওয়া আছে।

বিয়ের প্রথম রাতের পরের দিনই সিয়াম আর হাফসার ওলিমা হয়। খুব সাদামাটা ভাবে। এই দিনও হাফসাকে তার বান্ধবিরা সাজিয়েছিল কিন্তু সিয়াম মাহরাম আর মহিলা ব্যতীত কাউকে হাফসাকে দেখতে দেয় নি। হাফসা মোটেও খুশি ছিল না। হাফসার মা বাবা তাদের অনেক দোয়া করেছিলেন যাতে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। হাফসা বাবাকে বলেছিল :

- বাবা তুমি আমাকে কোথায় বিয়ে দিলে?

- নাদিম সাহেব শুধু একটা কথা বলছিল: আজ এই কথা বলছ তুমি কিন্তু কালের বিবর্তনে তুমিই এর উল্টা কথা বলবে যে বাবা! তুমি আমাকে উত্তম জায়গায় বিয়ে দিয়েছ। আমি সেই আশায় আছি। ইংশা আল্লাহ।

- হাফসা কেঁদে বুক ভাসায়। কারন হাফসার সাথে কোনো কিছুই এডযাস্ট হচ্ছে না। কিভাবে সে সংসার করবে।

- নাদিম সাহেব হাফসাকে বলল: মামুনি আমার যে রত্ন তুমি পেয়েছ সময় থাকতেই তার যত্ন করিও। হারিয়ে গেলে সারা জীবন কষ্ট পেতে হবে।

.

সিয়াম হাফসাকে নামাজ এর দাওয়াত দেয়। অনিচ্ছাকৃত ভাবে ৪ ওয়াক্ত নামাজ পরলেও ফজরের সময় হাফসা উঠে না। সিয়াম ফজরের নামাজের সময় হাফসার মুখে পানির ছিটা মারে কিন্তু হাফসা এতে খুবই বিরক্ত বোধ করে।

- আপনি এত সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন কেন? সকালে ঘুমাতেও দিবেন না নাকি? তাও আবার পানির ছিটা মারেন।

সিয়ামের চেষ্টা ব্যার্থ হয়।

.

১ সপ্তাহ পর.....

হাফসার বান্ধবিরা হাফসাকে ফোন করছে বারবার। হাফসা ফোন রিসিভ করছে না।

- ফোন ধর তোমার ফ্রেন্ড ফোন করছে।

.

হাফসা ফোন রিসিভ করে বলল- আমি ভার্সিটি যাব না। এই বলে হাফসা ফোন কেটে দিল।

সিয়াম বলল- তোমার ফাইনাল পরীক্ষা কিছুদিন পর। এখন ক্লাস মিস করলে পরিক্ষা ভাল হবে না। আর তো কটা দিন তারপর তুমি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করবে। তোমার বাবা বলেছিল তোমার গ্র্যাজুয়েশন টা যাতে তুমি কর। চল তোমাকে ভার্সিটি পৌছে দিয়ে আসি।

সিয়াম হাফসাকে গিফট করা বোরখা নিয়ে এসে হাফসার হাতে দিল। বলল :

- আজ থেকে ঘরের বাহিরে পর্দা করে যাবে। আমি আমার বউকে শুধু দেখব। অন্য কোনো পরপুরুষ আমার বউকে দেখবে সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। আমি জেলাস ফিল করি এই বিষয়ে।

হাফসা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলে:

- আমার বাবাও আমাকে বোরখা পরাতে পারে নি । আর আপনি বলছেন? আমি ভুত হয়ে বাহিরে যাব? বান্ধবিরা দেখে হাসবে।

- হাসলে হাসাটা উড়িয়ে দিবে। পর্দা ফরজ বিধান আল্লাহর। তুমি শুরু কর। দেখবে এর মায়ায় পরে গেছ। কিন্তু মনে রেখ পর্দা ছাড়া আমি তোমাকে ঘরের বাহিরে যেতে দিব না। আমি তোমার স্বামী। আধিকারটা একটু বেশিই আমার।

.

হাফসা দাত কিড়মিড় করে বোরখাটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে চেঞ্জ হতে গেল। অবশেষে আল্লাহর আশেষ রহমতে হাফসা বোরখা পরল। কিন্তু মন থেকে না।

সিয়াম হাফসাকে দেখে বলে উঠল: মাশা আল্লাহ।

.

হাফসা নিকাব পরেছে। চোখ দুটি শুধু দেখা যাচ্ছে । সিয়াম বলল: তুমি এটা দিয়েই শুরু কর। পরে তুমি আল্লাহর ইচ্ছায় হাত পা মোজাও পরবে।

হাফসার কপালে ভাজ পরল। এই লোকটা বলে কি? এমনিতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, বমি বমি লাগছে, আমার কেমন কেমন জানি গায়ের ভিতর লাগছে আর এই লোকটা আবার বলে হাত পা মোজা ও পরতে । কি পেয়েছে কি আমাকে? আর আমিই বা কেন তার কথা মেনে নিলাম? কিছু বলতেও পারছি না কেন?

.

সিয়াম আর হাফসা একসাথে বের হয়। তারা দুজন পাশাপাশি হাটছে। সিয়ামের সাদা পাঞ্জাবী আর হাফসার কালো বোরখা। রং দুটিই যেন তাদের বন্ধনকে জানিয়ে দিচ্ছে।

- আমার তো সামর্থ্য নেই তোমাকে নিজস্ব গাড়িতে উঠানোর বা সিএনজি ভাড়া দেওয়ার। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আমি তোমাকে পাবলিক বাসে করে নিয়ে যেতে পারি। তোমার ফাইনাল পরিক্ষা পর্যন্ত আমি তোমাকে দিয়ে আসব এবং নিয়ে আসব।

দুজন তারা বাস স্ট্যান্ড এর যাওয়ার জন্য হাটছে। হাফসা খেয়াল করল আজ হাফসার দিকে কেউ তাকায় না। কি আশ্চর্য ব্যাপার! যে হাফসাকে মানুষ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখত আজ হাফসাকে কেউ তাকিয়ে দেখছে না। নিজেকে হাফসার অনেক ছোট মনে হল। কেউ তার দিকে ফিরে তাকায় না ।

পাবলিক বাসে দুজন পাশাপাশি সিটে বসা। হাফসার ভার্সিটিতে যেতে বড় জোর ১০ মিনিট লাগবে। কিন্তু জ্যামে পরলে ৩০ মিনিট।

সিয়াম হাফসাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল :

- হাফসা তুমি কি জানো মেয়েদের ইসলাম প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ বলেন:

" হে নারীগন! তোমরা তোমাদের ঘরের ( বাড়ীর চতুর্সীমানার) ভিতর অবস্থান কর এবং বাহিরে বের হইয় না, যেমন ইসলাম পূর্ব জাহিলী যুগের মেয়েরা বের হত। ( সুরা আহযাব- ৩৩)।

" হে নবি! আপনি আপনার পত্নীগনকে ও কন্যাগনকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগনকে বলুন, যখন কোনো প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়, তখন তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয় ( যেন পর্দার ফরজ বিধান লংঘন না হয়। এমনকি তাদের চেহারাও যেন খোলা না রাখে, তারা যেন বড় চাদরের ঘোমটা দ্বারা নিজেদের চেহারাকে অাবৃত করে রাখে)। ( সুরা আহযাব- ৫৯)।

.

আর মুসলিম নারীদের মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তাদের নিরাপত্তা বিধানে বলেছেন-

" ঈমানদার নারিকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ্যমান তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্তবাদী, যৌনকামনা মুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পকে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণ না করে। হে মুমিনগন! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। ( সুরা নুর-৩১)।

.

হাফসা দেখ আমাদের সৃষ্টিকর্তার সাবধানবানী!

আল্লাহ আমাদের নারী পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নত রাখতে বলেছেন।

এরপর আমাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করতে বলেছেন।

নারীদের সৌন্দর্য বাহিরে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন।

নারীরা কাদের কাদের তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবে তাও বলে দিয়েছেন।

তাছাড়া নারীর সাজসজ্জা যাতে প্রকাশ না পায় তার জন্য জোরে পদচারণ করতে মানা করা হয়েছে।

.

বর্তমান সময়ে তোমরা যা করছ তা অাদো সঠিক না। পর্দাকে তোমরা বলছ যে পর্দা নাকি তোমাদের আবদ্ধ করে রেখেছে, স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, আসলে পর্দা আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ট নিরাপত্তা নারীদের জন্য। কিন্তু অাফসোস! সেই নারী জাতিই পর্দার মূল্য বুঝে না।

পর্দা না করলে জাহান্নামের আগুনে জলতে হবে আজীবন। তুমি কি রান্না করেছ কখোনো? বিয়ের পর তোমার রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য হল না আমার।

- হাফসা মনে মনে বলল : সৌভাগ্য না, বলেন দুর্ভাগ্য। আমার হাতের রান্না খাইলে চিতপটাং হয়ে পরে থাকবেন।

সিয়াম বলতে লাগল, তুমি যখন রান্না প্রথম প্রথম শিখবে তখন দেখিও তোমার হাতে আগুনের তাপ এসে লাগবে, হাত জালা যন্ত্রনা করবে। কখনও কখনও গরম তেল হাতের উপর এসে পরবে, সেখানে সাথে সাথে ফোসকা পরবে।

দুনিয়ার এই সামান্য আগুন আর তাপই সহ্য হয় না। বেপর্দা হয়ে জান্নাহামের আগুনের তাপ সহ্য কিভাবে করা যায় বল তো?

.

রাসূলুল্লাহ ( সা) বলেছেন- তোমাদের ( ব্যবহৃত) আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। ( বুখারি- ৩০৩৭)।

তো ভেবে দেখ! দুনিয়ার আগুনের চেয়ে আরও ৬৯ ভাগ বেশি আগুনের তীব্রতা! আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার! আল্লাহ আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত কর। আমীন।

.

তো! স্বামী হিসেবে আমার দায়িত্ত আছে। আমি আমার পরিবারকে জাহান্নামের আগুনে জলতে দিতে পারি না। আল্লাহ আমাদের বলেছেন-

" হে বিশাসী বান্দাগন! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতাগন। তারা আল্লাহ তা' আলা যা আদেশ করেন তা অমান্য করে না এবং তারা তাই করে যা তাদের আদেশ করা হয়। ( সূরা তাহরীম- ৬)।

হাফসা সিয়াম এর দিকে তাকাল- আবার চোখ নীচু করল।

.

জানো হাফসা! আমি যদি তোমাকে দাওয়াত না দেই, ইসলাম সম্পকে না বুঝাই, তাহলে আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করবেন। কেননা, তুমি আমার অধিনস্তে আছ আর আমার তোমার প্রতি দায়িত্ব আছে।

রাসূলুল্লাহ ( সা) বলেছেন, জেনে রাখ! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং নিজ নিজ অধীনস্থের বিষয়ে তোমাদের প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। ( মুসলিম- ১৮২৯)।

.

হাফসা তুমি কি জান? দাইয়ুস কাকে বলে?

হাফসা উত্তরে বলল- না।

সিয়াম জানিয়ে দিল: দাইয়ুস হল ঐ ব্যক্তি যে তার পরিবারের অশ্লীলতা ও কুকর্মকে মেনে নেয়। ( মুসনাদে আহমদ)।

আর দাইয়ুস ব্যক্তিকে আল্লাহ তা ' য়ালা কখনও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। ( মিশকাত- ৩৬৫৫)।

রাসূলুল্লাহ ( সা) বলেছেন- ৩ ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন-

১) নেশাদার দ্রব্যে আসক্ত ব্যক্তি

২) পিতামাতার অবাধ্য সন্তান

৩) দাইয়ুস ( মুসনাদে আহমদ- ৫৮৩৯)।

.

হাফসা সিয়ামের কথা খুব মনোযোগ দিয়েই শুনেছে। সিয়ামও বুঝতে পেরেছে। হাফসা সিয়ামকে কিছু একটা বলতে যাবে ঠিক ঐ মুহূর্তে পিছন থেকে কোনো একটা মেয়ে চিতকার করে উঠল। বাসের সবাই পিছন ফিরে তাকাল...

.

( চলবে ইন শা আল্লাহ)....

 

পরবর্তী পর্বগুলো আমার আইডিতে গিয়ে দেখেন ধন্যবাদ